Want create site? Find Free WordPress Themes and plugins.

সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে যাচ্ছে ।এমনিতেই গ্রীষ্মের টানা রোদ ; তার ভিতর সাড়ে তিন হাত মাটি খোঁড়াটা নেহায়েত কষ্টকর হয়ে উঠছে। এরপর আবার বাঁশ কেটে বেড়া তৈরি করতে হবে। মানুষের আসল ঘর তৈরি করাটা যে কত কষ্টকর তা আজ বুঝতে পারছি। এ জগতে মানুষ কত কিছুই না করে। অনেকের সাথে মায়া-মমতার সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। কেউ কেউ সবকিছু ভুলে অনেক টাকা পয়সা উপার্জন করে। তবে তার দশ-বিশ তলা দালানই থাক আর কুড়ে ঘর-ই থাক; তাকে সব শেষে যে ঘরটিতে থাকবে তার মাপ একই সমান। তবে সে কথা বলে আর কাজ নেই। এখন আমি এই কাজ তো করছিই তার ভিতর আরেকটা জ্বালা-যন্ত্রণা নিজের মধ্যে চেপে ধরে রাখতে হচ্ছে তা কাউকে বলতেও পারছিনা। কাকেই বা বলবো? যাকে বলতাম সে তো আজ অভিমানে পাথর হয়ে গেছে। তাকে আমি যতই বলি না কেন সে ওসব শুনে সান্ত্বনা তো দূরেই থাক “উফ!” পর্যন্ত করবে না। কারন সে এমন ঘুমন্ত অবস্থায় আছে যাকে কেউই জাগাতে পারবে না। বড্ড অভিমান হয়েছে তো, তাই। এই যন্ত্রণা যখন বেসামাল হয়ে যায়, তখনই ঝরনার মতো পানি ঝড়তে থাকে আমারই দুচোখ বেয়ে। আসলে যার জন্য মাটি খুঁড়ে এই ঘর তৈরি করছি সে আর কেউনা আমারই ছোট্ট বোন, ‘সুমি’। আমি এমনি এক হতভাগ্য, অকেজো বড় ভাই; যে তার ছোট বোনের জন্য এতোটুকু কিছুও করতে পারেনি। ছোট বোনের জন্য দায়িত্ব একজন ভাইয়ের যা থাকে তার বিন্দু মাত্রও আমি করিনি। তাই আজ নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে – “নীল! তুই পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ভাই। তোর বেঁচে থাকার অধিকার তাই আর নাই।” এই তো সেদিন! আমি, সুমি, মা, বাবা কতই না সুখে ছিল আমাদের এই ছোট্ট পরিবার। সুমির হাসি-ঠাট্টায় সারা বাড়ি সবসময় মাথায় উঠে থাকতো। সুমি ছোট বলে তার আদরও ছিল বেশি। তাকে বোন হিসেবে পেয়ে আমি অনেক খুশি, আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন সে আবার আমার বোন হয়ে জন্মায়। সে আমাকে যতটা ভালবাসে ততটাই সে আমাকে শ্রদ্ধা করে। যখন বাসায় আমার ডাক পড়ত, সেই তো ছুটাছুটি করে আমায় ডাকতো- “নীল ভাইয়া নীল ভাইয়া মা তোমায় ডাকছে” সেই কণ্ঠস্বর এখন আমার কানে ভেসে আসে। যখন পড়তে পড়তে আমার চোখ ঝিমিয়ে আসতো; ঠিক তখনই সে আমার ঘরে চা নিয়ে হাজির হতো। হয়তো সে লুকিয়ে লুকিয়ে আমার পড়াশুনা করা দেখত। আসলে সে আমার প্রতি অনেক যত্নবান ছিল। ছোট বোন বলে কি হবে, সে আমায় শাসনও করতো বটে। রাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে, সুমিইতো বাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিত। পরে অবশ্য বকাটা ওই দিত। কিন্তু ছোট বোনের হাতে বকা খাওয়াটা যে কত মিষ্টি তা বলে বুঝাতে পারবনা। শুনেছি বোনটা আমার আজ তিনদিন যাব হাস্পাতালে শীতল ঘরে বরফের উপর শুয়ে ছিল।যে বোন আমার সামান্য ঠাণ্ডা লাগায় নিজের কম্বলতা আমার উপর বিছিয়ে দিত সেখানে আমি! ভেবে আমি নিজেই আশ্চার্য হচ্ছি। আজ কটা দিন আমি এদিকওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছি। বাসায় পারছিনা কারন পিছনের দরজা খোলার মতো আজ আর কেউ নেই। সামনের দরজায় রয়েছে পুলিশি পাহারা। নিয়তির একি নির্মম পরিহাস, যে হাত ধরে আমার ছোট্ট বোন বড় হলো; আজ সেই হাতই তার জন্য কবর খুঁড়ছে। এ কেমন বিচার! যার জীবনটাই শুরু হল আজ সেই চলে গেল সবার আগে। আমি কি আর কোনদিন শুনতে পারবনা আমার বোনের মুখে “ভাইয়া” ডাকটি? হয়তোবা না। কিন্তু প্রত্যেক সকাল বেলায় নুপুর পায়ে লুকে লুকে এসে আমার গায়ে পানি ঢেলে ঘুম ভাঙিয়ে দেবে কে? কেইবা মার কাছে আমার নামে মিথ্যে নালিশ করবে? এসব ভাবতেই কেন জানি ভেতরটা হু হু করে ওঠে। গত বসর বৈশাখী মেলায় যখন চারদিকে উৎসব মুখর পরিবেশ, তখন আমার এই বোনটা মেলায় যাবার আবদার করেছিল। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য আমার, পরিক্ষার জন্য তা আমি পারিনি। শুধু পেরেছিলাম তাকে আগামী বৈশাখী মেলায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে। বলেছিলাম “সুমি রে! তোর ভাইয়ের যে সামনে পরিক্ষা। তোকে সামনের বার নিয়ে যাব”। বোনটা আমার এতটুকুও মন খারাপ করেনি। সে আমার দেয়া প্রতিশ্রুতি সানন্দে মেনে নিল। তার মধ্যে আমি কোনদিন জেদের লক্ষন দেখিনি। আসলে তার মতো বোন পাওয়া সত্যিই অনেক কষ্টের ব্যাপার। আমার ঘর থেকে সেদিন বের হতেই বাবা তাকে মেলায় নিয়ে যাবে বলেছিল। তার প্রতিউত্তরে সে বাবাকে যা বলেছিল তা আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে থাকবে। তার উত্তরটা ছিল- “ বাবা! সামনে ভাইয়ার পরিক্ষা, এখন যদি আমি একা একা তোমার সাথে মেলায় যাই তবে ভাইয়ার মন খারাপ হবে, আর আমারও একা একা মেলায় ভাল লাগবে না। তার চেয়ে আগামী বার আমারা ভাই-বোন এক সঙ্গে মেলায় গিয়ে মজা করবো। আর সেদিন দেখবে আমাদের মতো মজা কেউ করতে পারবে না”। সুমির সেই সাদ আমি আজ পুরন করতে চাইলেও পারব না। সে আমার উপর অনেক রাগ-অভিমান করে অনেক দূরে চলে গেছে। কেন? মনের ভিতর একটা প্রশ্নের হাহাকার “ কেন? কেন তুই আমাকে আর একটু সময় দিলি না? কেন? কেন? কেন? আমার বোন মাঝে মধ্যেই কাঁদতে কাঁদতে স্কুল থেকে বাসায় ফিরত। স্কুলের পড়া করতেই কেন জানি হটাৎ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। আমি প্রশ্ন করতেই বলত “তোর কেনর কোন উত্তর নেই”। এর কারন্তা অবশ্য মা জানত কিন্তু কেন যেন আমায় ব্বলার প্রয়োজন তিনি করেননি। একদিন দুপুর বেলায় স্কুল থেকে ফিরেই সে সোজা আমার ঘরে ঢুকল। কাঁধ থেকে স্কুল ব্যাগটাও নামায়নি। দেখেই মনে হচ্ছিল কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা আমায় বলবে। অনেক তালবাহানা করে আসল কথাটা আমায় বলেই দিল। বলল কি জঘন্য পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন সে স্কুল থেকে বাসায় ফিরে। কথাতা সুনেই আমার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে এলো। সে বলেছিল আমাদেরই গ্রামের কতকগুলো ছেলে তাকে বিভিন্ন ধরনের কথা বলে আর মাঝে মাঝে তার ওড়না ধরে টানাটানি করতো। ধরেই নিয়েছিলাম তাদের শায়েস্থা করবো, কিন্তু বাবার জন্য তা ইওয়ে ওঠেনি। বাবা গেলেন গ্রাম্য মাতব্বর আর মুরুব্বিদের কাছে। তাদের কাছে কোন সুরাহা হবে বলে আমি আশা করিনি। আর সেতাই হয়েছে। গ্রামের ওই ছেলেগুলো ছিল মকছুদ মাতব্বরের একমাত্র ছেলে সোহেলের বন্ধু। সোহেলও এর ভিতর জরিত থাকায় বিচারের রায় আমাদের বিপক্ষেই এলো। শেষমেশ আমার বোনের স্কুল যাওয়া বন্ধের উপক্রম। বাবা নালিশ তুলে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু  এর পর ছেলেগুলোর বিরক্তির মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেল। তারা আমার বোনের উপর যে পাশবিক অত্যাচার করেছিলো তা এই ভাইয়ের মুখে কেন, কোন ভাইয়ের মুখেই বলা সম্ভব না। আমার বোন যখন রক্তাক্ত অবস্থায় নিজের সম্ভ্রম হারিয়ে বাসায় ফিরে বাবা সঙ্গে সঙ্গে ছুটলেন পলিশের কাছে। আমি ওর পরিস্থিতি দেখে নিথর হয়ে দারিয়ে ছিলাম। আমার বোন শুধু একটিবার আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি দেখেছি, তার চোখে ছিল আমার প্রতি তীব্র অভিমান আর রাগ। এরপর সে কোনদিক না তাকিয়ে সোজা তার ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করল। সেই দরজাটা আর ভিতর থেকে খলা হয়নি। অনেক দাকাদাকির পর যখন দরজা সুমি খুলল না তখন না পেরে কয়েকজন মিলে দরজা ভেঙ্গে ভিতর ঢুকলাম। ভিতরে ধুকে দেখি আমার বোন সিলিং ফানের সাথে… না না ওই পরিস্থিতির কথা আমি কোনভাবেই করতে পারবো না। এরপর পুলিশ এলো, সাংবাদিক এলো; ময়না তদন্তও হল। কিন্তু তারা আমার বোনের ম্রিত্তুকে “সাধারন আত্মহত্যা” বলে গ্রহন করল। ডাক্তার সাহেবও ঐ একই গানের সুরে নাচতে লাগল। ফলে আমার বোনের মৃত্যুর আসল ঘটনাটা মিথ্যের চাদরে ঢাকা পরল। আমার ছোট বোনের মতো আর কত বোন এভাবে দিনের পর দিন চলে যাবে, কিভাবে এদের ন্যায় বিচার হবে তা আমি জানি না। আমার বোনের জন্য কেউ কি এগিয়ে আসবেনা রুখে দারাতে? যতদূর শুনেছি, বাংলাদেশ সরকার এইবকম অপরাধের একটা সুন্দর অথচ কুৎসিত নাম দিয়েছেন। নামটা হল “ইভ টিজিং”। এই অপরাধ থামানর জন্য সরকার ১ বসরের কারাদণ্ড অথরা ১০০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় শাস্তিতে দণ্ডিত করার বিধান করেছেন। এই আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোন বাহিনী গঠন করেছে কিনা তা আমার জানা নেই। তাছারা আমার বোনের জিবনের মূল্য মাত্র ১০০০ টাকা/ ১ বসরের জেল কেমন করে হল তাও সঠিক বলতে পারলাম না। বাড়িতে আবার পুলিশ এসেছে। আমায় এবার পালাতে হবে। বঙ্কে কবর দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু তা আর হল না। তোর মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের নামের তালিকা রেখে গেলাম। ইস! সাদা কাগজটা লাল হয়ে গেছে, নোংরা হয়ে গেছে। ক্ষমা করিস। চলে যাচ্ছি হয়তো বা দেখা হবে একদিন…

Did you find apk for android? You can find new Free Android Games and apps.